জীবন মানেই নিরন্তর সংগ্রাম,আর সেই সংগ্রামের পথ ধরেই এগিয়ে চলেছেন স্কাউটার নন্দিতা দাস। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও সীমাবদ্ধতা জয় করে তিনি আজ স্কাউটিং জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ স্কাউটস-এর ‘সহকারী লিডার ট্রেনার’ (ALT) পদে তার মনোনয়ন এই দীর্ঘ পথচলার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। নন্দিতা দাসের জন্ম এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে; চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ। বাবা সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রভাষক এবং মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষিকা। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক থাকায় স্নাতক (বিএ) পাসের পর তিনি রাজশাহী সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিপিএড (BPEd) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এরপর তিনি চলে গিয়েছিলেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে, যেখানে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন তার বড় ভগ্নিপতি রঞ্জিত কুমার দাস। মূলত সেই খানেই প্রথম স্কাউটিং-এর সংস্পর্শে আসেন নন্দিতা দাস। স্কাউটদের শৃঙ্খলা ও সেবামূলক কাজ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০০৪ সালে দিনাজপুরের ওসমানপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে 'বেসিক কোর্স' সম্পন্ন করেছেন। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি তার প্রশিক্ষক মশিউর রহমান,হান্নান স্যার,শিবু প্রসাদ স্যার, রায়হান স্যার এবং বিশেষ করে বলাহারের প্রয়াত ছাত্তার স্যার কে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। এরপর নিজেকে আরো দক্ষ করতে বগুড়ার নওদাপাড়ায় 'অ্যাডভান্স কোর্স' এবং গাজীপুরের মৌচাক থেকে সফলভাবে 'উডব্যাজ' ও 'স্কিল কোর্স' সম্পন্ন করেছেন। ২০১৯ সালে মৌচাক থেকেই তিনি ৪১ তম সিএএলটি (CALT) কোর্স সম্পন্ন করেছেন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার 'সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার স্কাউট লিডার' হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময় তার সাথে জেলা স্কাউটের কমিশনার মোঃ সাজেদুল ইসলাম এবং সম্পাদক মোঃ রফিকুল ইসলাম (এলটি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সহকারী কমিশনার (গার্ল ইন স্কাউটিং) হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তবে সব পথ মসৃণ ছিলো না। ২০১৯ সালে নানা প্রাতিষ্ঠানিক ঘাত-প্রতিঘাতে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন তিনি। সমসাময়িক ও জুনিয়রদের এগিয়ে যেতে দেখে এক তীব্র অনুশোচনা থেকে গত ডিসেম্বরে তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব ফরিদুল ইসলামের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষক তার আগ্রহকে সাধুবাদ জানিয়ে উচ্চতর পর্যায়ে যাওয়ার পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষকের সবুজ সংকেত পেয়ে নন্দিতা দাস রাজশাহী আঞ্চলিক স্কাউট ভবন থেকে তার বাকী থাকা শর্তমূলক কোর্সটি শেষ করে ALT পদের জন্য আবেদন করেছিলেন। গত ৮ মে,২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ স্কাউটস-এর জাতীয় সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর,গত ২৯ জুন,২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে 'সহকারী লিডার ট্রেনার' (ALT) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সফলতার পিছনে নন্দিতা দাস বেশ কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের রোভার আবু হুরায়রা,শিক্ষার্থী ইয়ামিন (নরসিংদী) এবং ইউনিট লিডার আব্দুর রউফ-এর (সাঘাটা উচ্চ বিদ্যালয়,গাইবান্ধা) অনুপ্রেরণা তাকে প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছে। এছাড়াও তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন,সিরাজগঞ্জ জেলার সাবেক প্রয়াত সম্পাদক আবু তাহের মিয়া, রাজশাহী অঞ্চলের সহ সভাপতি সরকার সানোয়ার হোসেন (এলটি), আঞ্চলিক উপ কমিশনার মোঃ সাইফুল ইসলাম(এলটি), লিডার ট্রেনার প্রতিনিধি খালেকুজ্জামান খান (এলটি), ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক অলোক চক্রবর্তী, প্রোগ্রাম বিভাগের সহকারী পরিচালক আবু সাঈদ,রাজশাহী জেলার সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস,সিরাজগঞ্জ জেলার সহ সভাপতি কামরুল হাসান,রাজশাহী জেলার কাব লিডার স্বপন কুমার সরকার, সিরাজগঞ্জ জেলার স্কাউট লিডার আব্দুস সবুর মিয়া (এএলটি), ফরিদপুরের মোল্লা ফরিদ আহমেদ (এলটি), নরসিংদীর আকরাম সরকার সুমন (এলটি) এবং কুমিল্লার সহকারী শিক্ষক মোঃ সবির উদ্দিন (এএলটি) প্রতি তাদের দোয়া ও দিক-নির্দেশনা না থাকলে এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো না বলে মনে করেছেন স্কাউটার নন্দিতা দাস। সব বাধা পেরিয়ে নন্দিতা দাস আজ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের স্কাউটদের কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।