জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে টানা তিন ম্যাচে ভেঙে পড়ল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারের পর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও প্রথম দুই ম্যাচ হেরে সিরিজ খুইয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। আজ (১১ জুলাই) হারারেতে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লড়াইয়ে নেমেছে সফরকারীরা। পুরো সফর জুড়ে দলের মূল সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাটিং লাইনআপের বারবার ধসে পড়া, যদিও পেসার নাহিদ রানার ঐতিহাসিক বোলিং সফরের একমাত্র উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থেকেছে।
সফরের প্রেক্ষাপট: দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে গিয়েও হোঁচট
সফরে যাওয়ার আগে দারুণ ছন্দে ছিল নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। ঘরের মাঠে সাম্প্রতিক সময়ে টানা চার টেস্ট জিতে আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় ছিল দলটি আর জিম্বাবুয়ে সফরকে দেখা হচ্ছিল আগস্টে অস্ট্রেলিয়া সফরের কঠিন পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির বড় মঞ্চ হিসেবে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর জিম্বাবুয়ের মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ, সবশেষ ২০২১ সালের হারারে টেস্টে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ সেঞ্চুরি করে সাদা পোশাকের ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ইতিবাচক প্রেক্ষাপট মাঠের পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হয়নি উল্টো সফরের প্রতিটি ধাপেই ব্যাটিং বিভাগের একই দুর্বলতা বারবার ফিরে এসেছে।
একমাত্র টেস্ট: ২৫ বছরের রেকর্ড ভাঙা লজ্জাঃ সফরের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারার পর পরের ২৫ বছরে দুই দলের মধ্যে হওয়া আরও ২০ টেস্টে বাংলাদেশ সাতবার হারলেও কখনো ইনিংস ব্যবধানে হারেনি। এবার সেই তেতো স্বাদ আবার পেল দলটি। হারারেতে আগে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৪০ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। জবাবে জিম্বাবুয়ে একমাত্র ইনিংসে তোলে বিশাল ৪১০ রান। ফলো অনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসেও প্রতিরোধের কোনো আভাস দেখাতে পারেনি সফরকারীরা আউট হওয়া দশ ব্যাটসম্যানের প্রত্যেকেই ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন, অধিকাংশই খোঁচা মেরে। মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের ৬১ রানের চতুর্থ উইকেট জুটিই ছিল ইনিংসের সর্বোচ্চ, কোনো ব্যাটসম্যান ফিফটির দেখাও পাননি; দলীয় সর্বোচ্চ রান মুশফিকের ৩৪। মাত্র আড়াই দিনেই ইনিংস ও ৮৫ রানে ম্যাচ শেষ হয়ে যায়। এই হারের প্রভাব পড়ে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ র্যাঙ্কিংয়েও, যেখানে বাংলাদেশ নেমে যায় পাকিস্তানের নিচে।
প্রথম ওয়ানডে: নাহিদ রানার ইতিহাস, তবু হার
টেস্টের ক্ষত শুকানোর আগেই ওয়ানডে সিরিজ শুরু হয় আরও এক হতাশা দিয়ে। টস হেরে ফিল্ডিংয়ে নেমে বাংলাদেশ প্রথমে দুর্দান্ত বোলিং করে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলে দেয় এক পর্যায়ে মাত্র ৭০ রানেই ৮ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়েছিল স্বাগতিকরা। এই ধসের মূল কারিগর ছিলেন তরুণ পেসার নাহিদ রানা, যিনি মাত্র ২১ রান খরচায় ৬ উইকেট নিয়ে ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে সেরা বোলিং ফিগারের নতুন রেকর্ড গড়েন, ভেঙে দেন রুবেল হোসেনের ২৬ রানে ৬ উইকেটের পুরনো রেকর্ড। নবম উইকেটে রিচার্ড এনগারাভা ও নিউম্যান নিয়ামহুরির ৬৩ রানের প্রতিরোধী জুটিতে জিম্বাবুয়ে শেষ পর্যন্ত থামে ১৪১ রানে।
কিন্তু মাত্র ১৪২ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ফের ব্যর্থ হয় বাংলাদেশের ব্যাটিং। দলীয় ১৭ রানের মধ্যেই শীর্ষ তিন ব্যাটার তানজিদ (৮), সৌম্য সরকার (৬) ও নাজমুল হোসেন (৩) সাজঘরে ফেরেন। তাওহিদ হৃদয় (২৫) ও নুরুল হাসান সোহানের (৩১) ৪৯ রানের জুটি কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও তা যথেষ্ট ছিল না। মোসাদ্দেক হোসেন (৩) ও অধিনায়ক মিরাজ (১০) দ্রুত ফিরে গেলে ৩৩.১ ওভারে ১১৬ রানেই অলআউট হয়ে যায় দল, ২৫ রানের হারে সিরিজ শুরু হয় দুঃখজনকভাবে। ম্যাচ শেষে নাহিদের বোলিং নিয়ে অধিনায়ক মিরাজ বলেন, “নাহিদ, গত কয়েকটি সিরিজে যেভাবে বোলিং করছে, সেটি সত্যিই অসাধারণ।” তবে দলের ধারাবাহিকতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
দ্বিতীয় ওয়ানডে: বাঁচা-মরার লড়াইয়েও একই চিত্র
সিরিজে টিকে থাকতে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না বাংলাদেশের সামনে, ফলে দ্বিতীয় ওয়ানডে পরিণত হয় সরাসরি বাঁচা মরার লড়াইয়ে। টস জিতে আবারও ফিল্ডিং বেছে নেয় বাংলাদেশ। শুরুতে তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানার তোপে চাপে পড়েছিল জিম্বাবুয়ে কিন্তু ওপেনার বেন কারেন এক প্রান্ত আগলে রাখেন। সিকান্দার রাজার সঙ্গে ৬৮ রানের জুটির পর শেষদিকে ব্র্যাড ইভান্সের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৯৯ রানের জুটি গড়ে জিম্বাবুয়েকে চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহে পৌঁছে দেন কারেন। ১৩৫ বলে ৯টি চারে ১১১* রানের ইনিংস খেলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি আর ইভান্স খেলেন মাত্র ৩৮ বলে অপরাজিত ৫৮ রানের ঝোড়ো ইনিংস তাসকিনের করা ইনিংসের শেষ ওভার থেকেই একাই তোলেন ২২ রান। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৬ উইকেটে ২৪৭ রান তোলে স্বাগতিকরা।
জবাবে ২৪৮ রানের লক্ষ্যে নেমে আবারও শুরুতেই বিপদে পড়ে বাংলাদেশ দলীয় ৩৮ রানে সৌম্য সরকার (৫) ও নাজমুল হোসেন শান্ত (৯) ফিরে যান; এরপর তানজিদ হাসান তামিম ও তাওহিদ হৃদয়ের তৃতীয় উইকেট জুটিতে আসে ৮৪ রান, যা ম্যাচে কিছুটা আশা জাগায়। তানজিদ ৫৭ রান করে ফেরার পর হৃদয়ও ফিফটি পূর্ণ করে ৬০ রানে আউট হন, আর তার বিদায়ের সঙ্গেই দলের ওপর চাপ ফিরে আসে। শেষদিকে নুরুল হাসান সোহান (৩৮) ও অধিনায়ক মিরাজ (২৭) লড়াই চালিয়ে গেলেও লোয়ার অর্ডারের বাকিরা সঙ্গ দিতে পারেননি, ফলে ৪৮ ওভার ১ বলে ২৩৪ রানেই অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ১৩ রানের এই হারে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করে জিম্বাবুয়ে, যা এই কন্ডিশনে বাংলাদেশের প্রায় চার বছরের মধ্যে (২০২২ সালের আগস্টের পর) প্রথম ওয়ানডে সিরিজ হার।
তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ: সম্মান বাঁচানোর লড়াই
সিরিজ আগেই হাতছাড়া হওয়ায় আজকের ম্যাচ এখন কার্যত হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর আনুষ্ঠানিকতার লড়াই। একাদশে দুটি পরিবর্তন এনে আজ হারারেতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ, আগের দুই ম্যাচের মতোই টস জিতে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন অধিনায়ক মিরাজ। প্রথম দুই ম্যাচে একই কৌশল আগে ফিল্ডিং করে নেওয়ার পরও ফল না পাওয়ায় আজকের ম্যাচে এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
মূল সমস্যা চিহ্নিতকরণ: ব্যাটিংয়ের একই বৃত্তে ঘোরাফেরা
তিন ফরম্যাটের তিনটি ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে একটি অভিন্ন প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে টপ অর্ডারের দ্রুত উইকেট হারানো এবং মিডল অর্ডারের একার লড়াই। টেস্টে ১০ উইকেটের প্রতিটিই ক্যাচ দিয়ে হারানো, প্রথম ওয়ানডেতে ১৭ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারানো, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৩৮ রানে দুই উইকেট হারানো এবং প্রতিটি ম্যাচেই শুরুর ধাক্কা সামলাতে না পারার মাশুল দিতে হয়েছে দলকে। জিম্বাবুয়ের মতো তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণের বিপক্ষেও এই দুর্বলতা প্রকট হয়ে ধরা পড়া উদ্বেগের বিষয়, বিশেষ করে আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সফরের আগে।
হতাশার এই সফরে একমাত্র বড় প্রাপ্তি নাহিদ রানার বোলিং। মাত্র ১৩-১৪ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি ছিল তার তৃতীয় পাঁচ-উইকেট শিকার, যা বিশ্ব ক্রিকেটে মোস্তাফিজুর রহিমের পর দ্বিতীয় দ্রুততম কীর্তি। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে ওয়ানডেতে সর্বাধিক পাঁচ-উইকেট শিকারের তালিকায় এখন তার ওপরে আছেন শুধু মোস্তাফিজুর রহমান। এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে, পেস আক্রমণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল প্রয়োজন শুধু ব্যাটিং বিভাগের সমান মানের ধারাবাহিকতা।
জিম্বাবুয়ে সফর শেষে বাংলাদেশ দল যাবে আয়ারল্যান্ডে, যেখানে তিনটি করে ওয়ানডে ও টি টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে দল। এরপর আগস্টে অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়া সফরের কঠিন পরীক্ষা। জিম্বাবুয়ে সফরে ধরা পড়া ব্যাটিং সংকট সমাধান না করে এগোলে সামনের কঠিন সফরগুলোতে আরও বড় ধাক্কার শঙ্কা থেকে যাচ্ছে দলের জন্য।
জিম্বাবুয়ে সফর বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। ঘরের মাঠের সাফল্য বিদেশের কন্ডিশনে প্রতিফলিত করতে না পারা এবং তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও ব্যাটিং বিভাগের বারবার ভেঙে পড়া এই দুটি বিষয় টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনার বিষয় হওয়া উচিত। তবে নাহিদ রানার মতো তরুণ প্রতিভার উত্থান দেখাচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা থাকলে দলের ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য এখনও অক্ষত আছে।