বাংলাদেশের সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ নানা দিক গবেষণার আলোকে তুলে ধরেছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) শিক্ষার্থীরা। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় সামাজিক আস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের কিশোরী ও তরুণীদের শিক্ষা, তাপপ্রবাহে অনানুষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে তরুণদের আত্মপরিচয় নির্মাণ, বিবাহিত নারীর উচ্চশিক্ষা, জেন্ডার নর্মস ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সমসাময়িক সামাজিক ইস্যু নিয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেন বিভাগের ১১ জন শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সেমিনার কক্ষ-৫০১-এ অনুষ্ঠিত থিসিস ডিফেন্স অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের গবেষণার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, প্রধান অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ এবং নীতিগত তাৎপর্য একাডেমিক প্যানেলের সামনে উপস্থাপন করেন। উপস্থাপিত গবেষণাগুলো বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যার বহুমাত্রিক বাস্তবতা ও সম্ভাব্য নীতিগত সমাধানের দিকনির্দেশনা তুলে ধরে।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে পরিচালিত মো. রাকিবুল ইসলামের গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল অর্থনৈতিক সামর্থ্যই নয়; সামাজিক আস্থা, আত্মীয়স্বজনের পরামর্শ, স্থানীয় চিকিৎসকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং সেবার সহজলভ্যতা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচালিত আরিজ বিনতে হাবিবের গবেষণায় উঠে আসে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকি মেয়েদের শিক্ষাজীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার অনানুষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের ওপর পরিচালিত মোসা. সাদিয়া আফরিনের গবেষণায় দেখা যায়, তাপপ্রবাহ তাদের আয় ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা হ্রাস এবং গৃহস্থালি দায়িত্বের দ্বৈত চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গোপালগঞ্জ জেলার জেনারেশন জেড তরুণদের নিয়ে পরিচালিত শেখ মঈনুল ইসলামের গবেষণায় দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু প্রযুক্তিগত সহায়ক নয়; এটি আত্মপরিচয় নির্মাণ, অনলাইন উপস্থিতি এবং সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এআই-নির্ভর পরিচয় নির্মাণের ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক চাপ এবং বাস্তব ও ভার্চুয়াল পরিচয়ের মধ্যে দূরত্বও বাড়ছে।
বিবাহিত নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় উঠে আসে, বিবাহ উচ্চশিক্ষার সমাপ্তি ঘটায় না; তবে পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্ব, সময়ের সংকট, সামাজিক প্রত্যাশা এবং আর্থিক নির্ভরতার কারণে তাঁদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।
এছাড়া জেন্ডার নর্মস ও পোশাকবিধি নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক নিয়ম ও প্রত্যাশা মেয়েদের আত্মবিশ্বাস, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ পেশা নির্বাচনে গভীর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ক গবেষণায় উঠে আসে, ভোটদানে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাঁদের উপস্থিতি এখনও সীমিত।
থিসিস ডিফেন্স শেষে একাডেমিক প্যানেল শিক্ষার্থীদের গবেষণার মান, পদ্ধতিগত দৃঢ়তা এবং সমসাময়িক বিষয় নির্বাচনকে উচ্চ প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে গবেষণাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রকাশনার উপযোগী করে তুলতে বিভিন্ন গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করা হয়।
থিসিস ডিফেন্স পরীক্ষা কমিটির সভাপতিত্ব করেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সায়েদা মাহমুদা। বহিঃস্থ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদ হোসেন খান। পরীক্ষা কমিটির সদস্য ছিলেন মো. মজনুর রশিদ, শামীমা নাসরিন এবং আইরিন পারভিন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সহযোগী অধ্যাপক মো. রবিউল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. হাসিবুর রহমান। এছাড়া সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল কালাম আজাদ, সহকারী অধ্যাপক শিমন রহমান ও প্রভাষক মো. নোমান আমীনসহ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।