একটি গ্রামের পরিবর্তনে সব সময় বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় একজন স্বপ্নবান মানুষের। যে বিশ্বাস করে, একটি বই শুধু পড়ার বিষয় নয়, বরং মানুষের চিন্তা, মনন ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার শালুয়াকান্দা গ্রামের কিশোর মেহেদি হাসান ফাহিম সেই স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছেন।
জলিল ও মোছা. আয়েশা দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে ফাহিম একজন। বর্তমানে তিনি গুজিরকোণা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। সেই ভালোবাসা থেকেই ২০২৪ সালে মাত্র ২০টি বই নিয়ে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লাল মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’।
প্রয়াত দাদা লাল মিয়ার স্মৃতিকে ধারণ করে গড়ে ওঠা এই পাঠাগারে বর্তমানে রয়েছে ৬৫০টিরও বেশি বই এবং প্রায় ১০০ জন নিবন্ধিত পাঠক। প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে এসে বই পড়ছেন, জ্ঞান অর্জন করছেন এবং নতুনভাবে ভাবতে শিখছেন।
পাঠাগারের অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলো বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা। যারা পাঠাগারে এসে বই সংগ্রহ করতে পারেন না, তাদের কাছে একজন সদস্য নিয়মিত বই পৌঁছে দেন এবং নির্ধারিত সময়ে তা সংগ্রহ করে আনেন। ফলে বইয়ের আলো পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায়।
শুধু জ্ঞানচর্চাই নয়, স্বাস্থ্যসেবাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই পাঠাগারে। এখানে বিনামূল্যে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ওজন মাপার ব্যবস্থা রয়েছে। বই পড়তে আসা অনেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচ্ছেন। ফলে পাঠাগারটি শিক্ষা ও মানবিক সেবার এক অনন্য মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মেহেদি হাসান ফাহিম জানান, তিনি ভবিষ্যতে একজন দক্ষ ও মানবিক চিকিৎসক হতে চান। মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই তার অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, এটি একটি গ্রামের জেগে ওঠার গল্প। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও মানবিক ও আলোকিত হয়ে উঠবে।”
এ বিষয়ে বাকলজোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউসুফ তালুকদার সাগর বলেন, “মেহেদি হাসান ফাহিমের মতো মেধাবী ও স্বপ্নবান তরুণ আমাদের সমাজের জন্য গর্বের। অল্প বয়সেই সে যে উদ্যোগ ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এই পাঠাগারের উন্নয়নে আমরা সব সময় পাশে থাকব, ইনশাআল্লাহ।”
স্মার্টফোননির্ভর এই সময়ে, যখন অনেক শিশুর হাত থেকে বই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন শালুয়াকান্দার কিশোর ফাহিম নীরবে প্রমাণ করে চলেছেন—একটি পাঠাগার শুধু বই রাখার স্থান নয়; এটি স্বপ্ন লালনের ঠিকানা, মূল্যবোধ গঠনের বিদ্যালয় এবং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম।