ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স গত ১২ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে গড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) রেকর্ড। কোম্পানিটি "SPCX" প্রতীকে লেনদেন শুরু করে এবং একই সঙ্গে টেক্সাসভিত্তিক নতুন নাসডাক টেক্সাস প্ল্যাটফর্মেও দ্বৈত তালিকাভুক্ত হয়।
কীভাবে নির্ধারিত হলো শেয়ারের দাম
গত ১১ই জুন প্রতিষ্ঠানটি তাদের শেয়ারের দাম চূড়ান্ত করে প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলারে, যেখানে মোট ৫৫ কোটি ৫৬ লাখ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই মূল্যে কোম্পানির প্রাক্কলিত মূল্যমান দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। রয়টার্সের ভাষ্যমতে, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা যাচাইয়ের জন্য সাধারণত অনুষ্ঠিত "রোডশো" প্রক্রিয়ার আগেই একটি নির্দিষ্ট মূল্য বেঁধে দেওয়ার এই কৌশলকে ওয়াল স্ট্রিটের প্রচলিত রীতি থেকে সরে আসা এক "টেক-ইট-অর-লিভ-ইট" পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকস, মরগান স্ট্যানলি, বোফা সিকিউরিটিজ, সিটিগ্রুপ ও জেপি মরগানের নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক এই আইপিও পরিচালনা করে, যেখানে মোট ফি ছিল সাধারণ ৪ থেকে ৭ শতাংশের তুলনায় অনেক কম মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ প্রায় ৫০ কোটি ডলার।
লেনদেনের প্রথম দিনেই বাজারমূল্য ছাড়াল ২ ট্রিলিয়ন ডলার
১২ই জুন লেনদেন শুরু হয় প্রতি শেয়ার ১৫০ ডলারে যা আইপিও মূল্যের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। দিনের মধ্যেই শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬১ ডলারে, অর্থাৎ প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাজার বন্ধ হয়, যাতে কোম্পানির বাজারমূল্য পৌঁছে যায় প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ মূল্যমানের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় স্পেসএক্স। কয়েকদিন পর শেয়ারের দাম ২০০ ডলার অতিক্রম করলেও, জুনের শেষ দিকে একটি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বন্ড ইস্যু নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয়ের জেরে দাম সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়।
কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) গুয়েন শটওয়েল নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে নাসডাক মার্কেটসাইটে ঘণ্টা বাজানোর অনুষ্ঠানে বলেন, "আজ আমরা আবারও ইতিহাস গড়লাম আর ইতিহাস গড়ার ঐতিহ্য আমাদের আছে। আমরা প্রায় ২২ হাজার কর্মী মিলে সন্দেহবাদীদের সন্দেহকে পেছনে ফেলে প্রতিদিন ঐতিহাসিক কিছু অর্জনের জন্য টিকে থেকেছি।" একই সময় টেক্সাসের স্টারবেস কেন্দ্রেও একটি পৃথক ঘণ্টা বাজানোর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
তিনটি ব্যবসার সমন্বয়ে গঠিত মূল্যমান
স্পেসএক্সের আয়ের মূল উৎস তিনটি ভাগে বিভক্ত স্টারলিংক (স্যাটেলাইট ইন্টারনেট), রকেট উৎক্ষেপণ সেবা, এবং সম্প্রতি যুক্ত হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবসা। কোম্পানির নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট আয় হয়েছিল ১৮ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ৬৯ শতাংশের বেশি এসেছে স্টারলিংক থেকে, প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ এআই খাত থেকে, এবং বাকিটা রকেট ব্যবসা থেকে। তবে বিপুল এআই বিনিয়োগের কারণে কোম্পানিটি ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার নিট ক্ষতির মুখে পড়ে, যেখানে আগের বছর তাদের মুনাফা ছিল ৭৯ কোটি ১০ লাখ ডলার।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্পেসএক্স তাদের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান xAI-কে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি পুরোপুরি শেয়ার-বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে, যার ফলে স্টারলিংকের বিশাল স্যাটেলাইট অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয় xAI-এর গ্রক (Grok) মডেল ও এক্স (X) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম। কোম্পানির প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছে, তাদের মোট সম্ভাব্য বাজার আকার ২৮ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ৯০ শতাংশই এআই খাত থেকে আসার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ এখনও ইলন মাস্কের হাতে
আইপিওর পরও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন ইলন মাস্ক। দ্বৈত-শ্রেণির শেয়ার কাঠামোর কারণে তিনি কোম্পানির প্রায় ৪২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলেও ভোটাধিকারের প্রায় ৮৫ শতাংশ তার নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া তিনি ৩৬৬ দিনের জন্য নিজের শেয়ার বিক্রি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্পেসএক্স এর আগে ২০০৮ সালে বেসরকারি খাতে প্রথম তরল-জ্বালানিচালিত রকেট কক্ষপথে পাঠানো, ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রথম বেসরকারি কার্গো সরবরাহ, এবং ২০১৫-১৭ সালের মধ্যে কক্ষপথ-শ্রেণির বুস্টার প্রথমবার অবতরণ ও পুনর্ব্যবহারের মতো একাধিক প্রথম কীর্তি অর্জন করে।
তুলনামূলক বিচারে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর ২০১৯ সালের আইপিও ছিল আগের রেকর্ড, যেখানে সংগ্রহ করা হয়েছিল ২৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। স্পেসএক্সের ৭৫ বিলিয়ন ডলারের আইপিও সেই রেকর্ডকে প্রায় তিন গুণেরও বেশি ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্পেসএক্সের এই বিপুল মূল্যমান মূলত ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, বর্তমান আয়ের তুলনায় নয় ২০২৫ সালের আয়ের প্রায় ৯৪ গুণ মূল্যে এই আইপিও হয়েছে। স্টারশিপ রকেটের সফল উৎক্ষেপণ, সরকারি চুক্তির ওপর নির্ভরতা এবং এআই খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাই হবে প্রতিষ্ঠানটির সামনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই বছরে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আইপিওর জন্য গোপনীয় নথি জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে ২০২৬ সালকে এআই-কেন্দ্রিক মেগা-আইপিওর বছর হিসেবে চিহ্নিত করছে।