দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন এমপিওভুক্তিকরণ (এমপিও) আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় আসার অপেক্ষায় থাকা হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লাখো শিক্ষক-কর্মচারী এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। এমপিওভুক্তির চূড়ান্ত তালিকা কবে প্রকাশ হবে এ প্রশ্ন এখন দেশের শিক্ষা অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এমপিও নীতিমালার আওতায় সারা দেশ থেকে ৩ হাজার ৬১৫টি স্কুল ও কলেজ নতুন এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেছে। এসব আবেদন ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে মূল্যায়নের পর ১ হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি এবং সরকারি অনুমোদন শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার এমপিওভুক্তির পুরো কার্যক্রম ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের সুপারিশ, দালাল বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই। এ ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় এমপিওবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর অত্যন্ত স্বল্প বেতন কিংবা বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতন সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিক্ষার্থী কমে গেলে শিক্ষকরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েন।
একজন এমপিওবিহীন শিক্ষক বলেন, "আমরা শুধু চাকরি করছি না, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলছি। কিন্তু মাস শেষে পরিবারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত এমপিওভুক্তি হলে আমাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।"
আরেকজন শিক্ষক বলেন, "প্রতিবার এমপিওর খবর শুনে নতুন আশা তৈরি হয়। কিন্তু তালিকা প্রকাশে দেরি হলে হতাশা বাড়ে। এবার যেন আর অপেক্ষা দীর্ঘ না হয়।"
একজন নারী শিক্ষক বলেন, "আমাদের অনেক সহকর্মী আর্থিক সংকটের কারণে পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। শিক্ষা খাতের জন্য এটি ভালো লক্ষণ নয়। যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এমপিওভুক্ত হওয়া উচিত।"
বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতারা বলছেন, যোগ্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দ্রুত এমপিওভুক্ত করা হলে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এমপিওর বাইরে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান সব শর্ত পূরণ করেও এখনও সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াবে। তবে দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষক সমাজের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে, তা অনেকটাই দূর হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে।
বর্তমানে সারা দেশের হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী অধীর আগ্রহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরই নির্ধারণ হবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান সরকারি এমপিও সুবিধার আওতায় আসছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, "এমপিও শুধু বেতন পাওয়ার বিষয় নয়। এটি একজন শিক্ষকের পেশাগত স্বীকৃতি, সম্মান ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তাই আমরা আশা করি সরকার দ্রুত একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।"