রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’তে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, সরকারি নির্ধারিত দরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মূল্যে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি আবাসিক ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনার ক্ষেত্রে সরকারি হিসাবে যন্ত্রপাতিগুলোর মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়া, মূল্য নির্ধারণ, কার্যাদেশ, বিল অনুমোদন এবং অর্থ পরিশোধ—প্রায় প্রতিটি ধাপেই অনিয়মের লক্ষণ পাওয়া গেছে। সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী অস্বাভাবিক দামে কোনো পণ্যের দর প্রস্তাব করা হলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। ২০১৭ সালে পাবনা গণপূর্ত বিভাগ ই-জিপির মাধ্যমে ১১টি ভবনের বাহ্যিক বিদ্যুতায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। প্রকল্পের আওতায় বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, জেনারেটর, লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে নিরীক্ষকরা মূলত বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম এবং জেনারেটর কেনার খাতেই সবচেয়ে বড় আর্থিক অসংগতির প্রমাণ পেয়েছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কিছু যন্ত্রপাতির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হলেও অন্য কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে। এতে দরপত্রের মোট মূল্য দাপ্তরিক প্রাক্কলনের কাছাকাছি থাকলেও নির্দিষ্ট সরঞ্জামের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়।
একটি ভবনের হিসাব বিশ্লেষণ করে নিরীক্ষা বিভাগ দেখতে পেয়েছে, উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য যেখানে ছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা, সেখানে বিল করা হয়েছে সাড়ে ৪ কোটি টাকারও বেশি। একইভাবে একটি বিতরণ ট্রান্সফরমারের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিল করা হলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল ৪০ লাখ টাকার কিছু বেশি।
এ ছাড়া নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, পাওয়ার ফ্যাক্টর সংশোধন প্যানেল এবং জেনারেটরের ক্ষেত্রেও কয়েক গুণ বেশি মূল্য পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু একটি ভবনের এসব যন্ত্রপাতির জন্য প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও সরকারি দরে সেগুলোর মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থপ্রাপ্তির হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান পাঁচটি ভবনের কাজ করে প্রায় ৯২ কোটি টাকা পেয়েছে, যদিও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১২ কোটি টাকা। অন্য একটি প্রতিষ্ঠান চারটি ভবনের জন্য পেয়েছে প্রায় ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী মূল্য ছিল ১০ কোটিরও কম। অপর একটি যৌথ উদ্যোগ দুটি ভবনের জন্য প্রায় ৩৯ কোটি টাকা বিল পেলেও সরকারি দরে সেই সরঞ্জামের মূল্য ছিল ৫ কোটিরও কম।
নিরীক্ষা বিভাগ বলছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির উচিত ছিল অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের কারণ জানতে চাওয়া এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কর্মসম্পাদন জামানতের সুপারিশ করা। কিন্তু এমন কোনো পদক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটি গঠনেরও যথাযথ নথি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিরীক্ষা আপত্তির জবাবে দাবি করেছিল, মোট দর দাপ্তরিক প্রাক্কলনের সীমার মধ্যেই ছিল। তবে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষা বিভাগ। তাদের মতে, শুধু মোট দর নয়, প্রতিটি পণ্যের মূল্যও যৌক্তিক কি না তা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন রাজশাহী গণপূর্ত জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিবর রহমান। সদস্যসচিব ছিলেন পাবনা গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদুল আলম। বিল পরিশোধকারী কর্মকর্তা হিসেবে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান খন্দকারের নামও রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ এই প্রথম নয়। এর আগে আবাসন প্রকল্পে বালিশ, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দরপত্র মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পরিশোধ করা প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মেগা প্রকল্পে সুশাসন নিশ্চিত না হলে জনগণের অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে। তার মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের বড় প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে দরপত্র প্রক্রিয়া, মূল্য নির্ধারণ এবং বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। অন্যথায় এমন অনিয়ম ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যাবে।